ঢাকা বৃহস্পতিবার, জুলাই ৭, ২০২২

Popular bangla online news portal

কুড়িগ্রামে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ, প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা


সংলাপ প্রতিনিধি
৭:০১ - রবিবার, জুন ১৯, ২০২২
কুড়িগ্রামে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ, প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা

কুড়িগ্রামে গত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত না হলেও নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। জেলার ৯টি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ায় নদী অববাহিকা নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে নিচু অঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ জন।

ব্রহ্মপুত্র নদের ভেতরে জেগে ওঠা দুর্গম চরাঞ্চলে থাকা অসংখ্য পরিবার নৌকা ও বাঁশের মাচাং-এ আশ্রয় নিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অনেকেই তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে উঁচু বাঁধ, মাটির টিলা এবং উচু সড়কে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। বন্যা কবলিত এলাকা সমূহে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নিজেদের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও অসংখ্য পরিবার বিপাকে রয়েছেন। অনেকে তাদের গৃহপালিত গরু-ছাগল উঁচু এলাকায় সরিয়ে নিতে পারলেও গো-খাদ্যের যোগান দিতে না পারায় বিপাকে পড়েছে তারা। বন্যা কবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে শিক্ষা বিভাগ।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর পারবতীপুরের জব্বার আলী জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে ঘরের ভিতর আর থাকার উপায় নেই। বর্তমানে নৌকায় অবস্থান করছি। ৩/৪ দিন ধরে পানিতেই বসবাস করছি। সহায় সম্বল যা ছিল সব কিছুই পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোন সরকারি সহযোগিতা পাইনি। চুলা জ্বালানোর মতো সুযোগও নেই। সেখানে এ রকম অসংখ্য পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছেন। এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কোথাও সরকারি সাহায্যের ছিটে ফোঁটাও পৌঁছেনি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার নতুন নতুন এলাকায় নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। খরস্রোতা তিস্তার তীব্র ভাঙনে উলিপুর উপজেলার থেতরাই ও বজরা ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে নিদারুণ কষ্টে রয়েছে। বেশ কিছু ঘরবাড়ি এখন ভাঙনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে রাজারহাট উপজেলার ডাংরা বাজারের অদূরে তিস্তানদী তীরবর্তী এলাকায়।

জেলার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মশালের চরের সহরত আলী জানান, কোন রকমে ঘরের মাঁচাং উঁচু করে বউ বাচ্চা নিয়ে আছি। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে আর ঘরে থাকারও উপায় থাকবে না। এখন কি করমো কোনটে জামো বুঝবার পারছি না।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া জানান, আমার ইউনিয়নের মশালের চর ও পুর্বমশালেরচরসহ আশেপাশে প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় অনাহারে-অর্ধাহারে আছে। এরমধ্যে কিছুসংখ্যক পরিবার ফকিরের চর আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিলেও কেন্দ্রটিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি।

বন্যা কবলিত এলাকাসমুহের জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় সবমিলে আনুমানিক লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছে।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টিপাতে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে । উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং টিম ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ সমন্বয় কক্ষ চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে পানির তোড়ে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে দুধকুমার নদীর তীর রক্ষা বাঁধের ১শ মিটার ভেঙে কয়েকটি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লা আল মামুন জানান, পানির তোড়ে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ১শ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। আপাতত পানি সামান্য বৃদ্ধি পেলেও অনেকটাই স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত যা পূর্বাভাস রয়েছে তাতে আগামী দুই দিন পর্যন্ত পানি সামান্য আপডাউন করতে পারে। তারপর পানি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বন্যা কবলিতদের জন্য ৯ উপজেলায় ২শ ৯৫ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১১ লাখ টাকা, শুকনো খাবার ১ হাজার প্যাকেট, ১৭ লাখ টাকার শিশু খাদ্য ও ১৯ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলার রৌমারী, রাজিবপুর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতেও দ্রুত শুরু হবে।