ঢাকা সোমবার, অক্টোবর ৩, ২০২২

Popular bangla online news portal

ভোট ঘিরে তৎপর কূটনীতিকরা


সংলাপ ডেস্ক
৩:৫৮ - শনিবার, জুলাই ১৬, ২০২২
ভোট ঘিরে তৎপর কূটনীতিকরা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর দেড়েক বাকি। কিন্তু রাজনীতির মাঠে ভোটের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে এখনই। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তৎপরতাও লক্ষণীয়। এরই মধ্যে চলছে কৌতূহলী নানা আলোচনা ও বিতর্ক। নির্বাচন কেমন হবে বা কার অধীনে হবে- এ নিয়ে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ চলছে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে যাবেন না তারা। তাদের দাবি, সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতিও অনাস্থা জানিয়েছে বিএনপি। আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী হবে আগামী নির্বাচন। দুপক্ষের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেই শুরু হয়েছে ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকদের ব্যস্ততা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও বৈঠক করছেন তারা।

কূটনীতিকদের এমন দৌড়ঝাঁপকে প্রকাশ্যে গুরুত্ব দিতে না চাইলেও ক্ষমতাসীনরা যে চাপের মুখে আছে দলটির নেতাদের কথাবার্তায় তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ‘বিদেশিরা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর অধিকার রাখে না’- প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করলেও বারবার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। অবশ্য বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের তৎপরতাকে ভালো চোখে দেখছেন না কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরফলে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

মূলত, বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ বাড়ে। সেইসঙ্গে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কাছে ধরনা দিতে দেখা যায়। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিএনপি বরাবরই সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি কূটনৈতিকদের কাছে নালিশ জানিয়ে আসছে। কেন তারা নির্বাচনে যেতে চায় না- তাও কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরেছে। গত বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলি এবং আগের দিন মঙ্গলবার জাতিসংঘের নবনিযুক্ত আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। বৈঠকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া না নেয়া, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেড় ঘণ্টা তাদের আলোচনা চলে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বা বিদেশি শক্তি যতবড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন বাংলাদেশের নির্বাচনে তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না- মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিএনপি বিদেশি বা উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হলে তাদের জনগণের কাছেই যেতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় যেতে হবে।

বিদেশি শক্তির জ্ঞান দানে বিচলিত নয় আওয়ামী লীগ : আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে- এমনটা ভাবছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এজন্য তৃণমূল গোছানো, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেয়া এবং সাফল্যগাথার প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে দলটি। গত ৭ মে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ হবে বলে সবাইকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন দলীয়প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সব দলই অংশ নেবে বলে আশাবাদী তিনি। বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, আগামী নির্বাচন প্রতিদ্ব›িদ্বতাপূর্ণ হবে। এ জন্য নেতাকর্মীদের আরো বেশি করে জনগণের কাছে যেতে হবে, ভোট চাইতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সবাইকে শক্ত প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেই জয়ী হতে হবে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পর আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যেই জনমত গঠন ও মাঠ জরিপের কাজ শুরু করেছে দলটি। এক্ষেত্রে উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা। দেশের বিষয় নিয়ে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেয়া রাজনৈতিক দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বিদেশিদের কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা মোটেও কাম্য নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ যে কোনো সমস্যা আমরা নিজেরাই বসে সমাধান করতে পারি। আর যদি না পারি, কোনো বিদেশি এসে তা সমাধান করতে পারবে না। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূত কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি কাউকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানোর অধিকার রাখে না মন্তব্য করে দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের নাক গলানো সমীচীন নয়। গলাতে না চাইলেও বিএনপি তাদের নাকটা নিয়ে ওদের কাছে যায়। এটি দেশকে ছোট করার শামিল। তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় বিদেশিদের কাছে ছুটে যায়, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে, বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার কাছে তারা দৌড়ঝাঁপ করে। এ দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। এ দেশের জনগণই ক্ষমতার মালিক এবং তারাই প্রতিনিধি নির্বাচন করে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ভোরের কাগজকে বলেন, বাঙালি জাতি দীর্ঘদিন ভিন জাতির শক্তিশালীদের কাছে পদানত ছিল, তাই তাদের ত্রাণকর্তা মনে করেন অনেকেই। এই নিম্ন মানসিকতা থেকে কেউ কেউ তাদের পদলেহন করে স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টা করেন। জাতির পিতার কন্যা, বাঙালির আপন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেশকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, আমরা এখন আর কোনো বিদেশি শক্তির জ্ঞান দানে বিচলিত হই না। আমাদের সিদ্ধান্ত আমাদের জাতি গ্রহণ করবে। তবে, আমরা গ্লোবাল ভিলেজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে পরিণত হতে চাই না। সবার সঙ্গে সমতা, সম্মান ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্কে বিশ্বাস করি।

এমন সংস্কৃতি দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে : আগামী নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনকেও এক ধরনের চাপে রাখার পুরনো কৌশলে রয়েছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। গত ২১ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাইকমিশনের নেতৃত্বে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্টভুক্ত (ওইসিডি) ১৪টি দেশের রাষ্ট্রদূতরা সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ৮ জুন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। জাতীয় নির্বাচনের আগে বিদেশিদের এমন দৌড়ঝাঁপকে ভালো দৃষ্টিতে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এ ব্যাপারে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণেই এমনটি সবসময় হয়ে আসছে। তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এই সংস্কৃতির ফলে দেশও ছোট হচ্ছে।